সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪০ অপরাহ্ন
বিশেষ প্রতিনিধিঃ মোঃ রুবেল সিকদার
বরিশালকে অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান
বরিশাল অঞ্চলকে দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করতে দীর্ঘমেয়াদি ‘ভিশন বরিশাল-২০৫০’ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে বরিশাল ডিভিশনাল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিডিজেএ)। একই সঙ্গে পদ্মা সেতুকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলে সৃষ্টি হওয়া নতুন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে শিল্প, বাণিজ্য, যোগাযোগ, পর্যটন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকার, গণমাধ্যম, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বরিশাল ডিভিশনাল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘আগামীর বরিশাল: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে এসব কথা বলা হয়। সেমিনারে বরিশাল অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য ১০ দফা কৌশলগত সুপারিশও তুলে ধরা হয়।
সেমিনারে বিডিজেএর উপদেষ্টা ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বরিশাল বিভাগ দেশের কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। দেশের মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ এ অঞ্চল থেকে আসে। মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল বিপুল জনগোষ্ঠীও রয়েছে। পাশাপাশি কুয়াকাটা, ভাসমান পেয়ারা বাজার ও সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে পরিকল্পিত শিল্পায়ন ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার অভাবে বরিশাল এখনো তার সম্ভাবনার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করতে পারেনি। বিসিক শিল্পনগরী থাকলেও বিনিয়োগ, মূলধন ও জ্বালানি সরবরাহের নানা সীমাবদ্ধতায় শিল্পের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ ঘটছে না।
এ অবস্থায় ভোলার গ্যাসসহ দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো, কৃষি ও মৎস্যপণ্যের মূল্য সংযোজন এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সেমিনারে বরিশাল অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে বিডিজেএর পক্ষ থেকে যে ১০ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ, সুপেয় পানি ও জলবায়ু অভিযোজনের জন্য পৃথক উপকূলীয় উন্নয়ন মন্ত্রণালয় গঠন; ঢাকা-পদ্মা সেতু-বরিশাল-পটুয়াখালী-পায়রা রেল যোগাযোগ চালু এবং ভাঙ্গা-কুয়াকাটা মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা।
পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে লজিস্টিক হাব ও প্রসেসিং অঞ্চল গড়ে তোলা, ধান, মাছ, পেয়ারা ও আমড়ার মতো স্থানীয় পণ্যের মূল্য সংযোজনের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও কোল্ড চেইন সুবিধা নিশ্চিত করা এবং প্রবাসীদের বিনিয়োগে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়।
এ ছাড়া নদীভাঙন, বন্যা ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ডেল্টা মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ, গুরুত্বপূর্ণ নদীপথে নিয়মিত ড্রেজিং, ব্লু-ইকোনমির সম্প্রসারণ এবং বরিশাল, পটুয়াখালী, কুয়াকাটা, বরগুনা ও সুন্দরবনকে সমন্বিত করে পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়।
তরুণদের ঢাকামুখী প্রবণতা কমাতে আইটি হাব, কারিগরি ও মেরিন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে আঞ্চলিক উন্নয়ন ও জলবায়ু গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। পাশাপাশি ‘ভিশন-২০৫০’ বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে বরিশাল অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। পানিই হতে পারে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি। চট্টগ্রাম পানি ও বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতির সুফল পেলেও বরিশাল তার বিপুল জলসম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেনি।
তিনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলকে ঘিরে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে সম্মিলিতভাবে তা বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে হবে।
প্রধান আলোচক তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান বলেন, বরিশালের উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ নেতৃত্ব ও ভালো রাজনীতিবিদ তৈরি করা জরুরি। রাজনীতিতে নতুন ও যোগ্য প্রজন্মের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হতে পারে।
বিশেষ অতিথি নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান বলেন, উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সমন্বয় ও ঐক্য। রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে বরিশাল অঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, সড়ক, সেতু ও যোগাযোগ ব্যবস্থার যেসব দাবি উঠে এসেছে, সেগুলো বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, অতীতে ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে বরিশালের উন্নয়নের অনেক উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে বর্তমান সময়কে তিনি দক্ষিণাঞ্চলের জন্য সম্ভাবনার সময় হিসেবে উল্লেখ করে গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো নিয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, উন্নয়নের পাশাপাশি মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রতিটি এলাকাকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও নিরাপদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, পটুয়াখালীতে বিশেষায়িত প্রসেসিং জোনের কাজ এগিয়ে চলছে এবং বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও বাড়ছে। এটি পুরোপুরি চালু হলে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। এ জন্য ছয় লেনের সড়ক এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বরিশাল-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মজিবুর রহমান সরোয়ার, ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম জামাল, পিরোজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য রুহুল আমিন দুলাল এবং পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
এ ছাড়া বক্তব্য রাখেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আকন কুদ্দুস, সাবেক সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান, বরিশাল মেট্রোপলিটন চেম্বারের প্রেসিডেন্ট ও বিডিজেএর উপদেষ্টা মো. নিজাম উদ্দিন, শ্যামলীর ২৫০ শয্যা টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার, বরিশাল প্রেস ক্লাবের সভাপতি অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম খসরু, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, বিডিজেএর উপদেষ্টা আবু জাফর সূর্য, পটুয়াখালী জার্নালিস্ট ফোরামের সভাপতি বদরুল আলম নাবিল এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কে এম শরিয়াতুল্লাহসহ অনেকে।
বিডিজেএর সভাপতি মাহবুব সৈকতের সভাপতিত্বে সেমিনার সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সানবির রুপল। আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ও নির্বাহী কমিটির সদস্য কাজী জেবেলও অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন।
সেমিনারে বিডিজেএর সিনিয়র সহ-সভাপতি এম. এম. বাদশাহ, সহ-সভাপতি কে জেড সোহেল, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব জুয়েল, সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিন, অর্থ ও দফতর সম্পাদক ফাহিম মোনায়েম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইউসুফ বাচ্চু, প্রশিক্ষণ ও কল্যাণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিন্টুসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া বিডিজেএর সাবেক সভাপতি তারিকুল ইসলাম মাসুম, মিজান সবুজ, কাজী জেবেল, এটিএন নাজিয়া আফরিনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সাংবাদিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।